মহীয়সী যাইনাব কোবরা’র (সা.আ.) ট্রাজেডি

  • Posted: 25/09/2022

হুজ্জাতুল ইসলাম মো. আলী মোর্ত্তজা

হযরত যাইনাব কোবরা একজন মহান ও মহীয়সী নারী। মুসলিম বিশ্বে হযরত যাইনাবের যে সম্মান তা কোথা থেকে অর্জিত হল? এটাও বলা যায় না যে, তিনি হযরত আলীর কন্যা, হাসান ও হুসাইনের বোন সেজন্য এত সম্মানিত। কেননা শুধুমাত্র বংশের জন্য কাউকে এতটা সম্মানীত বলা যায় না। সব ইমামেরই মা, বোন এবং কন্যা ছিলেন কিন্তু কেউ কি হযরত যাইনাবের সমকক্ষ হতে পেরেছিলেন? হযরত যাইনাব কোবরা’র মর্যাদাও শুধুমাত্র তাঁর বংশের কারণে নয় বরং তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব দায়িত্বটি পালন করেছিলেন তার জন্য তিনি এত বেশী সম্মানিত। তাঁর কাজ, তাঁর সিদ্ধান্ত এবং তাঁর আন্দোলন তাঁকে এত মর্যাদবান করেছে। যিনিই এমন দায়িত্ব পালন করবেন তিনি যদি আমিরুল মুমিনিন হযরত আলীর কন্যা নাও হন তাতেও তিনি সম্মানিত ও মর্যাদাবান হবেন। তার মর্যাদার বেশীরভাগই হল প্রথমতঃ তিনি পরিস্থিতিকে বুঝতে পেরেছিলেন। ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালায় যাওয়ার পূর্বের পরিস্থিকে তিনি বুঝে ছিলেন, আশুরার দিনের পরিস্থিতি বুঝে ছিলেন এবং আশুরার পরের পরিস্থিতিকেও তিনি ভালভাবে বুঝতে এবং উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। আর দ্বিতীয়তঃ প্রতিটি পরিস্থিতিতে তিনি একটি সুন্দর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। এই সিদ্ধান্তই যাইনাবকে প্রতিষ্ঠিত ও মর্যাদাবান করেছে।

কারবালায় আসার পূর্বে ইবনে আব্বাস, ইবনে জাফরসহ বহু নামকরা সাহাবা এবং সাহাবাদের সন্তানগণ ওই পরিস্থিতিতে কর্তব্য কি তা বুঝতে অক্ষম ছিলেন এবং ইমাম হুসাইনকে তারা সঙ্গ দেন নি। কিন্তু যাইনাব কোবরা পরিস্থিতি ও দায়িত্ব বুঝতে পেরেছিলেন এবং ইমামকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। এমনটি নয় যে, তিনি জানতেন না যে সামনে অনেক সমস্যা রয়েছে। বরং সব কিছু জেনে বুঝেই তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন। তিনি এমন একজন নারী ছিলেন যিনি স্বামী সংসার ছেড়ে ছোট বাচ্চাদেরকে সাথে নিয়ে ইমামের সাথে কারবালায় উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি পরিস্থিতিকে ভালভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ওই জটিল ও সংকটময় অবস্থায় যেখানে বাঘাবাঘা লোকেরাও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না সেখানে তিনি সঠিকভাবে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং প্রিয় ভাইকে সমর্থন করে ও শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের পর যখন দুনিয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল তখন এই মহীয়সী নারী-ই আলোকিত সূর্যের ন্যায় আবির্ভূত হন। যাইনাব কোবরা সালামুল্লাহ আলাইহা মর্যাদার এমন একটি অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিলেন যেখানে কেবল মহামানবগণ অর্থাৎ নবীগণ পৌঁছাতে পারেন।

প্রকৃতপক্ষে যাইনাব ছাড়া কারবালাকে কল্পনাই করা যায় না। যাইনাব কোবরা ছাড়া আশুরার ঐতিহাসিক ঘটনা টিকে থাকত না। আশুরার ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হযরত যাইনাবের ব্যক্তিত্ব ও ভূমিকা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে মনে হয় তিনি আলীর কন্যার বেশে এবং নারীর পোশাকে দ্বিতীয় হুসাইন হিসাবে জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেন। এছাড়াও যদি যাইনাব কোবরা না থাকতেন তাহলে আশুরার ঘটনার পর ইমাম সাজ্জাদও শহীদ হয়ে যেতেন এবং ইমাম হুসাইনের বার্তা কারও কাছে পৌঁছাত না। আশুরার ঘটনার পূর্বেও হযরত যাইনাব কোবরা ইমাম হুসাইনকে সহানুভুতি দিতেন এবং যাইনাব থাকতে ইমাম হুসাইন আর কোন একাকীত্ব এবং অসহায়ত্ব অনুভব করতেন না। এমনকি কোন ক্লান্তিও অনুভব করতেন না। হযরত যাইনাব কোবরা এমনই এক মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারীনি ছিলেন যিনি ইমামকে সার্বক্ষনিক সহানুভূতি দান করতেন। আর এই বিষয়টি তাঁর আচরণ, বক্তব্য ও ভূমিকার দিকে একটু দৃষ্টিপাত করলেই আমরা সহজেই তা বুঝতে পারব।

দুইবার হযরত যাইনাব কোবরা আতঙ্কিত হয়েছিলেন আর ইমাম হুসাইন (আ.) সেটাকে উল্লেখ করেছেন। একবার যখন একটি স্থানে হযরত মুসলিম ইবনে আকিলের শাহাদাতের খবর আসে তখন তিনি আতঙ্কিত হয়েছিলেন। যদিও তিনি অত্যন্ত সাহসী এবং ধৈর্যশীল ছিলেন তারপরও তিনি একজন নারী। তার মধ্যেও সহানুভূতি ও আবেগ কাজ করে। কেননা নবীর পরিবারই তো সকল সহানুভূতি এবং আবেগের কেন্দ্র। সাহস, দৃঢ়তা, ধৈর্য ও দায়িত্ববোধের পাশাপাশি তাদের মধ্যেও রয়েছে অঢেল মানবতা এবং দয়া ও ভালবাসা। ইমাম হুসাইনকে দিয়েই উদাহরণ দেয়া যায়। তিনি এক বিশাল মরুভূমিতে যেখানে চারিদিক থেকে তাকে হায়েনার দল ঘিরে রেখেছে তিনি সামান্যতম ভয় পান নি। কিন্তু যখন তার কৃষ্ণাঙ্গ দাস শাহাদাত বরণ করেছিল তিনি যুদ্ধের ময়দানে ছুটে গিয়ে তার মাথা নিজের কোলে তুলে নিয়েছিলেন। জোওন একজন সাধারণ কৃৃতদাস ছিল এবং খুব একটা সম্মানিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিল না। অথচ তার চেয়েও অনেক নামিদামী ব্যক্তিরা ইমামের জন্য কারবালার ময়দানে শাহাদাত বরণ করেছিলেন, যেমন হাবিব ইবনে মাজাহের কিন্তু ইমাম তাদের সাথে এরূপ আচরণ করেন নি। মুসলিম বিন আওসাজাকে বলেছিলেন: আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিবেন। কিন্তু এই দাস যার কোন সন্তান এবং আত্মীয়স্বজন ছিল না যারা তার জন্য ক্রন্দন করবে এজন্যই ইমাম তার প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতি প্রদর্শন করেছিলেন। যেভাবে ইমাম নিজের সন্তান হযরত আলী আকবারকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন এই কৃতদাসকেও সেভাবেই কোলে তুলে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় বরং তিনি এই কৃতদাসের মুখে চুম্বন করেছিলেন। এটার নাম মমতা, সহানুভূতি এবং ভালবাসা। সুতরাং হযরত যাইনাব কোবরাও মমতায় পরিপূর্ণ। শুধু তাই নয় তিনি ইমাম হুসাইনের বোন, এমন বোন যিনি স্বামী সংসার ছেড়ে দুই সন্তান আওন এবং মোহাম্মাদকে সাথে নিয়ে ভাইয়ের সাথে দ্বীনকে রক্ষা করার জন্য কারবালায় এসেছিলেন। আমার যতটুকু ধারনা হয়তবা আব্দুল্লাহ বিন জাফর প্রথম দিকে রাজি ছিলেন না যে, বিবি যাইনাব তার সন্তানদেরকে সাথে নিয়ে আসুক। কিন্তু পরবর্তীতে রাজি হলে বিবি যাইনাব তাদেরকে এনেছিলেন। আর এই জন্য এনেছিলেন যে, যদি প্রয়োজন হয় তাহলে দ্বীনের পথে ভাইয়ের জন্য নিজের সন্তানদেরকেও কোরবানি করবেন। সুতরাং যখন তিনি কোনো স্থানে বিপদ অনুভব করতেন ভাইয়ের কাছে গিয়ে বলতেন, আমি আতঙ্ক অনুভব করছি এবং পরিস্থিতিকে বিপদজনক মনে করছি। তিনি জানতেন যে শাহাদাত বরণ করতে হবে এবং বন্দি হয়ে যেতে হবে। তারপরও তিনি বিষয়টিকে অনুভব করে ইমামকে বলতেন। কিন্তু ইমাম সেখানে তাকে বিশেষ কিছু বলতেন না। তিনি শুধু বলতেন: কোন সমস্যা নেই। আল্লাহ যেটা চান সেটাই হবে, তুমি চিন্তিত হয়ো না। এর পরে আমরা আশুরার রাতের আগ পর্যন্ত হযরত যাইনাব কোবরাকে ইমাম হুসাইনের কাছে কোন প্রকার বিচলতা, উৎকণ্ঠা, কষ্ট, হতাশা এবং আতঙ্ক প্রকাশ করতে দেখি নি।

আশুরার রাতেও হযরত যাইনাব কোবরা অনেক কষ্টের কারণে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেছেন: আমি অসুস্থতার কারণে খিমায় (তাবু) শুয়ে ছিলাম আর আমার ফুফু হযরত যাইনাব কোবরা আমার পাশে বসে আমার সেবা করছিলেন। পাশের খিমায় আমার বাবা ইমাম হুসাইন অবস্থান করছিলেন এবং তার দাস জওন আগামীকাল যুদ্ধের জন্য তলোয়ারে ধার দিচ্ছিল। তখন আমি শুনতে পেলাম যে, আমার পিতা একটি কবিতা আবৃত্তি করছেন যার অর্থ হচ্ছে দুনিয়া কারও বিশ্বস্ত হয় না এবং মৃত্যু নিকটেই।

ইমাম হুসাইন আবৃত্তি করছিলেন:
হে দুনিয়া! তোমাকে ধিক্কার জানাই। কেননা তুমি দিনে ও রাতে কত বন্ধু ও অনুরাগিকে হত্যা করেছ। (বিহারুল আনওয়ার ৪৪তম খণ্ড, পৃ: ৩১৬)

এটা থেকে বোঝা যায় যে, যিনি এই কবিতাটি পাঠ করছেন তিনি নিশ্চিত যে, খুব শীঘ্রই তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিবেন। ইমাম সাজ্জাদ বলেন: আমি এই কবিতাটি শুনেছি এবং এই কবিতার উদ্দেশ্যও বুঝতে পেরেছি যে ইমাম তাঁর শাহাদাতের খবর দিচ্ছেন। তারপরও আমি নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমার ফুফুর দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি খুবই কষ্ট পাচ্ছেন এবং আমার পাশ থেকে উঠে তিনি ইমাম হুসাইনের খিমায় ছুটে গিয়ে বললেন: হে আমার প্রাণ প্রিয় ভাই! আপনি তো নিজের শাহাদাতের খবর দিচ্ছেন। আমরা তো আপনাকে নিয়েই বেঁচে আছি। যখন নানা নবী, মা ফাতিমা এবং বাবা আলী শহীদ হলেন তখনও আমি ভাবতাম আমার ভাইয়েরা তো আছেন। ইমাম হাসান শহীদ হলেন তখন নিজেকে বুঝিয়ে ছিলাম যে, ভাই হুসাইন তো বেঁচে আছেন। আর এখন আপনিও তো আমাদেরকে ছেড়ে যাওয়ার এবং শহীদ হওয়ার খবর দিচ্ছেন।

এমন একটি অবস্থায় বিচলিত হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং এই পরিস্থিতিতে বিবি যাইনাবের জন্য আতঙ্কিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি বিশ্বাস করি ওই দিন হযরত যাইনাবের জন্য যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল একটি ব্যতিক্রম পরিস্থিতি। হযরত যাইনাবের মনের অবস্থার সাথে অন্য কোন নারী এবং এমনকি ইমাম সাজ্জাদের মনের অবস্থাকেও তুলনা করা যায় না। হযরত যাইনাব কোবরার মনের অবস্থা খুবই কঠিন ও অসহনীয় ছিল। আহলে বাইতের সকল পুরুষরা শাহাদাত বরণ করেছিলেন। আশুরার বিকালে অসুস্থ ইমাম যাইনুল আবেদিন ছাড়া আর কোন পুরুষ জীবিত ছিল না। তখন বিবি যাইনাব কষ্টে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। আপনারাই কল্পনা করে দেখুন ৮৪ জন নারী ও শিশু নিয়ে বিবি যাইনাব কোবরা ৩০ হাজার দুশনের মাঝে বন্দি রয়েছেন। এই নারী ও শিশুদের মধ্যে সকলেই ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত, সবার অন্তর দুঃখ-কষ্টে ও ব্যাথা-বেদনায় জর্জরিত। সকল শহীদদের লাশ কাফনহীন এবং ছিন্নভিন্ন অবস্থায় কারবালার জমিনে পড়ে আছে। যাদের মধ্যে কেউ সন্তান কেউ আবার ভাই। মোটকথা বিষয়টি অত্যন্ত কষ্টকর এবং পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক। যাইহোক এখন এই পরিস্থিতিকে কোন একজনকে অবশ্যই সামাল দিতে হবে। আর তিনি হচ্ছেন হযরত যাইনাব কোবরা।

হযরত যাইনাব কোবরা কারবালার ময়দানে শুধু তাঁর ভাই এবং দুই সন্তানকেই হারান নি বরং নবী পরিবারের ১৮জনকে কারবালার ময়দানে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছিল। সুতরাং সেই কষ্ট ও চাপ হযরত যাইনাবের উপর ছিল। এ ছাড়াও ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের পর যারা অবশিষ্ট ছিল তাদের সবার দেখভাল করা এবং তাদের পরিচালনা করার গুরু দায়িত্বও বিবি যাইনাবের কাঁধেই ছিল। এমনকি অসুস্থ ইমাম যাইনুল আবেদিনের দেখাশুনার দায়িত্বও বিবি যাইনাবের উপর ছিল। সুতরাং কারবালার ঘটনার পর থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগ পর্যন্ত বিবি যাইনাবের উপর যে কি কঠিন পরিস্থিতি অতিবাহিত হয়েছে সেটা কেবল আল্লাহই ভাল জানেন। অতএব এই সময়ে হযরত যাইনাব কোবরা দৌড়ের উপর ছিলেন। কখনও এই শিশুর কাছে কখনও ওই শিশুর কাছে কখনওবা সন্তানহারা এক মায়ের কাছে তো আবার সন্তানহারা আরেক মায়ের কাছে গিয়ে তাকে সান্তনা দিচ্ছিলেন। কিন্তু কখনো আবার হযরত যাইনাব নিজেও ভেঙ্গে পড়ছিলেন এবং ভাইকে ডাকছিলেন এবং বলছিলেন এখন আমাদের কি উপায় হবে।

রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে বিবি যাইনাব একবার ভাইয়ের লাশের কাছে এসে ফরিয়াদ করে বলছেন:
হে আমার প্রিয় নানা মুহাম্মাদ! আরশের ফেরেশতার সালাম আপনার উপর বর্ষিত হোক। এই হল আপনার হুসাইন যে নিহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় জমিনে পড়ে আছে। (লুহুফ পৃ: ১৩৩)

এই যে বলা হয় কারবালায় তলোয়ারের উপর রক্তের বিজয় হয়েছে এবং কথাটা শতভাগ ঠিক। মূলতঃ এই বিজয়ের কান্ডারী ছিলেন হযরত যাইনাব কোবরা। কেননা রক্তের বিষয়টি কারবালায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাহ্যিকভাবে মিথ্যার কাছে সত্য পরাজিত হয়েছে। কিন্তু যে বিষয়টি এই বাহ্যিক পরাজয়কে প্রকৃত বিজয়ে রূপান্তরিত করেছে তা হল বিবি যাইনাব কোবরার ব্যক্তিত্ব, আচরণ ও ভূমিকা যা সত্যিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারবালার ঘটনা প্রমাণ করে যে, নারী, ইতিহাসের কোন পার্শ্ব চরিত্র নয় বরং ইতিহাসের মূল ও কেন্দ্রিয় চরিত্র। পবিত্র কোরআনও এই বিষয়টি বারংবার উল্লেখ করেছে। তবে কারবালার ঘটনাটি হচ্ছে নিকটতম ঘটনা এবং তা অন্য কোন জাতির ঘটনা নয় বরং তা হচ্ছে রাসূলের উম্মতের ঘটনা। এটা একটি জীবন্ত ও বাস্তব ঘটনা যা মানুষ হযরত যাইনাব কোবরা’র জীবনে দেখতে পারে যে, একজন নারী কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। হযরত যাইনাব কোবরা এমন কাজ করলেন যার ফলে বাহ্যিকভাবে বিজয় অর্জনকারী এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েলকারী ক্ষমতাসীন দল নিজের প্রাসাদেই অপমানিত ও লাঞ্ছিত হল। তাদেরকে চিরতরের জন্য ইতিহাসের কলঙ্কিত মানুষে পরিণত করল এবং তাদের বিজয়কে পরাজয়ে পর্যবসিত করল। এটা ছিল হযরত যাইনাব কোবরা’র মহান কাজ। হযরত যাইনাব প্রমাণ করলেন যে, হিজাব ও পবিত্রতাকে একটি বিশাল ও সম্মানিত জিহাদে রূপান্তরিত করা যায়।

হযরত যাইনাব কোবরা’র ভাষণ থেকে যা রয়ে গেছে এবং আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে তা থেকে আশুরা বিপ্লবে এই মহীয়সী নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও কাজের মহত্বকে উপলব্ধি করা যায়। কুফার বাজারে হযরত যাইনাব কোবরা’র ঐতিহাসিক ভাষণ কোন সাধারণ ভাষণ নয়, কোন মহান ব্যক্তিত্বের সাধারণ অভিব্যক্তি নয়। বরং ওই সময়ের ইসলামী সমাজের পরিস্থিতির একটি বৃহৎ বিশ্লেষণ। যা তিনি অত্যন্ত বাগ্মিতার সাথে, সুন্দরভাবে ও পরিপূর্ণভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত যাইনাবের ব্যক্তিত্বের শক্তিটা একবার দেখুন তিনি কত বড় শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী তা একবার চিন্তা করুন।

মাত্র দুই দিন আগে কারবালার মরুপ্রান্তরে যার ভাই, ইমাম এবং নেতাকেসহ আরও অনেক যুবক ও প্রিয়জনদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাকেও কিছু সংখ্যক নারী ও শিশুদের সাথে বন্দি করে জনসমক্ষে আনা হয়েছে। খালি উটের উপরে বন্দি অবস্থায় তাদেরকে লোকেরা দেখছে, উল্লাস করছে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে, ঠাট্টা-বিদ্রæপ করছে এবং অনেকে আবার কেঁদেছেও। এরকম একটি সংকটময় পরিস্থিতিতে হঠাৎ একটি সোনালী সূর্যের আবির্ভাব হচ্ছে। আর এমনভাবে ভাষণ দিচ্ছেন ও এমন ভাষায় তাদের সাথে কথা বলছেন যে ভাষায় তার মহান পিতা আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব মিম্বরে বসে উম্মতের সাথে কথা বলতেন। বাচনভঙ্গি, শব্দের প্রয়োগ, বাক্যালঙ্কার এবং কথার ভাবার্থ ও তাৎপর্যও একই। তিনি বলেন: হে প্রতারণাকারী! কুফাবাসী। তোমরা নিজেদেরকে ইসলাম এবং আহলে বাইতের অনুসারী দাবি কর। কিন্তু তোমরা পরীক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছ। ফেতনায় তোমরা অন্ধ হয়ে গেছ।

তোমাদের মধ্যে কোন প্রকার ইনসাফ নেই। তোমাদের কথা ও কাজে কোন মিল নেই। তোমাদের আচরণ, কথা এবং অন্তরের সাথে কোন মিল নেই। তোমরা অহংকারী হয়ে গেছো। তোমরা মনে করেছ তোমাদের ঈমান আছে, মনে করেছ তোমরা বিপ্লবী অনুরূপভাবে মনে করেছ তোমরা হযরত আলীর অনুসরণ করছ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ছিল না। তোমরা ফেতনার মোকাবেলায় বিজয় অর্জন করে নিজেদেরকে মুক্তি দিতে পার নি।

তোমরা তার মত হয়ো না, যে পরিশ্রম করে সূতা বোনার পর সেগুলো আবার টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে। তোমাদের উপমা তাদের মত যারা পশম দিয়ে সূতা বুনে আবার তা খুলে ফেলে পুণরায় সেগুলোকে পশমে পরিণত করে। অদূরদর্শিতার কারণে, বিচক্ষণতার পরিচয় না দেয়ার কারণে, অদক্ষতার কারণে এবং হক ও বাতিলকে বুঝতে না পারার কারণে তোমরা তোমাদের অতীতকে ধ্বংস করে ফেলেছ। তোমাদের বাহ্যিক দিক হচ্ছে ঈমানের দাবিদার, মুখে বিপ্লবী হওয়ার ফুলঝুরি। কিন্তু তোমাদের বাতিন হচ্ছে অন্তসারশূন্য, তোমরা বিবেকহীন এবং তোমাদের মধ্যে বাতিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মত কোন ইচ্ছা ও শক্তি নেই। এটা হচ্ছে তোমাদের ব্যর্থতার মূল কারণ।

এতো বলিষ্ঠ বক্তব্য, এতো স্পষ্ট ভাষা তাও আবার ওই রকম পরিস্থিতিতে তা কেবল হযরত যাইনাবের পক্ষেই সম্ভব। এমনও ছিল না যে, সবাই তার বক্তব্য শোনার জন্য অধির আগ্রহে বসে আছে আর তিনি মিম্বরে উঠে তাদের জন্য আলোচনা ও বক্তব্য রাখছেন তাও কিন্তু নয়। বরং তার চারিপাশে তলোয়ার নিয়ে শত্রুরা তাদেরকে ঘিরে রেখেছে। আর যারা দেখতে এসেছে তারাও নানাবিধ চিন্তাধারা ও আকিদা বিশ্বাসের লোক। এরা তারাই যারা হযরত মুসলিমকে সাহায্য না করে ইবনে যিয়াদের হাতে তুলে দিয়েছিল। এরা তারাই যারা ইমাম হুসাইনকে চিঠি দিয়ে আসতে বলে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এরা তারাই যাদের ইবনে যিয়াদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা ছিল তারাই চুপ করে ঘরে বসে ছিল। কুফার বাজারে এই ধরনের লোকেরাই উপস্থিত ছিল। আর একদল এমন ছিল যারা ভয় পেয়ে গিয়েছিল আর এখন আমিরুল মু’মিনিনের কন্যাকে এই অবস্থায় দেখে তারা ক্রন্দন করছে।

হযরত যাইনাবের সামনে এই ধরনের লোকেরা অবস্থান করছেন আর তিনি দৃঢ়তার সাথে ভাষণ দিচ্ছেন। হযরত যাইনাব কোবরা ইতিহাসের বীরাঙ্গনা নারী তিনি কোন দূর্বল মানুষ নন। কোনভাবেই নারীকে দূর্বল ভাবা ঠিক নয়। কেননা এই মু’মিন নারীরা কঠিন পরিস্থিতিতে এভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করেন। এমন নারীই হচ্ছে উত্তম আদর্শ। তিনি সকল মহান পুরুষদের জন্য আদর্শ এবং সকল মহান নারীদের জন্য উত্তম আদর্শ। তিনি মহানবীর সময়কে এবং আমিরুল মু’মিনিনের সময়কে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন: তোমরা ফেতনার মধ্যে সত্য ও মিথ্যাকে আলাদা করতে সক্ষম হও নি এবং নিজেদের সঠিক দায়িত্ব পালন করতেও সক্ষম হও নি। যার ফলে আজ নবীর নাতির কাটা মাথা বর্ষার উপর অবস্থান করছে। হযরত যাইনাব কোবরা’র মহত্বকে এভাবে উপলব্ধি করতে হবে এবং বুঝতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন। (তথ্যসূত্র: মহামান্য রাহবার হযরত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী’র দৃষ্টিতে হযরত যাইনাব কোবরা ও কারবালার বার্তাবাহকদের আন্দোলন, ১/২/৮৯ ফার্সি সাল)

Share: