জ্ঞান পিপাসু হযরত যয়নাব (সা.আ.)

  • Posted: 25/09/2022

হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ আনিসুর রহমান, হিলি

হযরত যয়নাব (সা.আ.) ফজিলতপূর্ণ পরিবেশে এবং ঐশী জ্ঞানের মহিমায় জন্মলাভ করেন, তিনি একইভাবে আলোকোজ্জ্বলতার ছত্র ছায়ায় এবং জ্ঞান ও বিজ্ঞানের মধ্যেই শৈশব কাটিয়েছেন। তবে হযরত যয়নাব (সা.আ.) যে কেবল সেই পরিবেশে জন্মগ্রহণ ও বিকশিত হয়েছিল তা নয়, বরং এই বিষয়গুলি ছাড়াও, হযরত যয়নাব (সা.আ.) জ্ঞানান্বেষণ এবং সত্যান্বেষণে পিপাসু ছিলেন এবং তা অর্জন করার জন্য অধিক চেষ্টা করতেন এবং তার মর্যাদাপূর্ণ পরিবার যারা ছিলেন উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার উৎস তাদের কাছে প্রশ্ন করতেন; বিশেষ করে, ঐশী জ্ঞানের বিশুদ্ধ ঝর্নাধারা অর্থাৎ তাঁর পিতা আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) থেকে অনেক কিছু অর্জন করেছেন।

সর্বোত্তম বিষয় যা আমাদেরকে উল্লিখিত সত্যের নিকটবর্তী করতে পারে তা হল হযরত যয়নাব (সা.আ.) তার মহান পিতার -আল্লাহ তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত করুন- মুমূর্ষ অবস্থায় অর্থাৎ সেই ভয়ঙ্কর মুহুর্তগুলি যখন মহান ইমাম ইবনে মুলজিমের বিষাক্ত তলোয়ারের আঘাতের ফলে তার জীবনের শেষ মুহ‚র্তটিতে পৌঁছে ছিলেন সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং উম্মে আয়মানের বর্ণিত হাদীসানুযায়ী তা থেকে ইমামকে প্রশ্ন করেছিলেন; অর্থাৎ তিনি তার পিতাকে উম্মে আয়মান থেকে যে হাদীসটি শুনেছিলেন তার সত্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন এবং হযরত ইমাম আলী (আ.) তার মহামহিম মেয়ের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলেছিলেন যে, হাদীসটি সঠিক। এই হাদীসটি সেই হাদিস যার মধ্যে হযরত ইমাম যয়নুল আবিদীন এবং হযরত যয়নাব (সা.আ.) সম্পর্কে কিছু কথা রয়েছে, হাদিসটি হচ্ছে: কুদামাহ বিন যায়েদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে হযরত আলী বিন হুসাইন -যয়নুল আবিদীন (আ.)- বলেছেন: “হে যায়েদা! আমি খবর পেয়েছি যে তুমি মাঝে মাঝে আবি আবদুল্লাহ আল-হুসাইনের (আ.) কবর জিয়ারত কর। আমি বললামঃ এই বিষয়টি তেমনি যেমন আপনার কাছে পৌঁছেছে। তিনি বললেনঃ তুমি কেন এমন করছো যখন তুমি প্রশাসন ও শাসকের অধীনে একটি পদে অধিষ্ঠিত আছো আর তিনি এমন শাসক যিনি আমাদের পরিবারের প্রতি কারও ভালবাসা সহ্য করতে পারেন না এবং কেউ আমাদেরকে অন্যের চেয়ে বেশী পছন্দ করুক ও আমাদের গুণাবলী বর্ণনা করুক তা তিনি মেনে নিতে পারেন না?

আমি বললাম: আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি এ কাজের মাধ্যমে আল্লাহ ও রাস‚লের সন্তুষ্টি ছাড়া আর কিছুই চাই না এবং কারো ক্রোধকে আমি ভয় করি না; আর এতে যে দুঃখই আমার উপর আপতিত হোক না কেন আমি তার পরোয়া করি না। তিনি বললেনঃ আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, তুমি যা বললে তাই ঘটবে, তিনি এই কথাটি তিনবার উচ্চারণ করলেন আর আমিও জবাবে তিনবার একই কথা বললাম।

অতঃপর তিনি বললেনঃ তোমার জন্য সুসংবাদ, আবার তোমার জন্য সুসংবাদ, আবারও তোমার জন্য সুসংবাদ। এখন তোমাকে এমন এক খবর দিব যা আমার দৃষ্টিতে অসামান্য এবং অবশ্যম্ভাবী বিষয়: যখন কারবালায় আমাদের উপর সেই বিপর্যয় নেমে আসলো; আমার বাবা এবং তাঁর সাথে যারা ছিলেন বিশেষ করে তাঁর কয়েকজন ছেলে, ভাই ও অন্যান্য আত্মীয়কে হত্যা করা হল; তাঁর হেরেম ও মহিলাদেরকে উটের পিঠে বসিয়ে বহন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং তারা চাচ্ছিল আমাদের কুফায় নিয়ে যেতে, তখন আমি ঐ শহীদদের লাশের দিকে তাকালাম ও দেখলাম যে সকলেই মাটির উপর পড়ে আছে, কাউকেই দাফন করা হয়নি, এই বিষয়টি আমার বুকে খুব জোড়ে আঘাত হানলো এবং আমি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে উঠলাম এবং এমন মনে হচ্ছিল যেন আমার জীবন আমার শরীর ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছে। আমার ফুফু যয়নাব -আলীর মহান কন্যা- আমার অবস্থা লক্ষ্য করে আমাকে বললেনঃ হে আমার পূর্বপুরুষ দাদা, বাবা ও ভাইয়ের অবশিষ্টাংশ! তোমার কি হয়েছে, দেখে মনে হচ্ছে যেন মরে যাচ্ছ? আমি বললামঃ আমি কি করে বিচলিত ও অধৈর্য হব না? যখন আমি দেখছি যে, আমার কর্তা, আমার ভাই, চাচা, চাচাতো ভাই এবং আত্মীয়-স্বজনরা নিজেদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছে, তাদের জামা-কাপড়গুলোকে লুট করা হয়েছে, কেউ তাদেরকে কাফন পরায় নি এবং কবরও দেয়নি; কেউ তাদের কবরের কাছে একটু থামছেও না এবং কাছেও আসছে না, যেন মনে হচ্ছে তারা কাফের পরিবারের কেউ।

আমার ফুফু যয়নাব বললেন: এই বিষয়গুলি যেন তোমাকে বিচলিত না করে; খোদার কসম, এটা তোমার পিতামহ, পিতা ও চাচার সাথে আল্লাহর রস‚ল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামের একটি ওয়াদা-অঙ্গীকার এবং আল্লাহ এই উম্মতের একটি দল থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যাদেরকে এই পৃথিবীর ফেরাউনরা চেনে না এবং যারা আসমানবাসীদের নিকট অত্যধিক পরিচিত ও বিখ্যাত তারা এই বিক্ষিপ্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলো ও রক্তাক্ত মৃতদেহগুলোকে একত্রিত করে দাফন করবে, তোমার পিতার -সাইয়্যেদুশ শোহাদা- কবরের উপর এই দেশে একটি নিশান স্থাপন করবে যার প্রভাব কখনই কমবে না এবং রাত ও দিন তার আপন গতিতে অতিবাহিত হতে থাকবে কিন্তু তবুও তার মর্যাদা কখনও ম্লান হবে না এবং মুছে যাবে না, কাফেরদের নেতা ও তাদের পথভ্রষ্ট অনুসারীরা এই কবরটি মুছে ফেলা এবং ধ্বংস করার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যবহার করবে, কিন্তু তাদের প্রচেষ্টার কোনো ফল পাবে না বরং আরও বেশি উপস্থিতি, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বৃদ্ধি পাবে।

আমি বললামঃ ঐ ওয়াদা কোন ওয়াদা আর কোন খবর? হযরত যয়নাব (সা.আ.) বললেনঃ উম্মে আয়মান আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, একদিন রাস‚লুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফাতেমা’র (সা.আ.) ঘরে আসলেন, হযরত ফাতিমা (সা.আ.) তাঁর জন্য খাবারের আয়োজন করলেন এবং হযরত আলীও (আ.) কিছু পরিমাণ খেজুর তাঁর সামনে পরিবেশন করলেন।

উম্মে আয়মান বলেন: আমিও একটি পাত্রে দুধ ও অপর পাত্রে মাখন নিয়ে এলাম, আল্লাহর রস‚ল, আলী, ফাতিমা, হাসান ও হোসাইন তা থেকে দুধ পান করলেন।

তারপর তাঁরা খেজুর আর মাখন খেলেন অতঃপর রস‚লুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর হাত ধুলেন, আলী তাঁর হাতের উপর পানি ঢেলে দিলেন আর তিনি হাত ধোয়া শেষ করার পর মুখমন্ডল মুছে নিলেন, তারপর তিনি আলী, ফাতিমা, হাসান ও হোসাইনের দিকে তাকালেন আর আমরা তাঁর বরকতময় চেহারায় উৎফুল্লতার নিদর্শন দেখতে পেলাম। তারপর আকাশের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন ও কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে দু’হাত তুলে দোয়া করলেন। অতঃপর তিনি সেজদায় গেলেন এবং এমনভাবে কান্না শুরু করলেন যেন তাঁর কন্ঠরোধ করেছে ও চোখ থেকে অবিরত অশ্রু ঝরছে, তারপর তিনি মাথা উঠালেন এবং দৃষ্টি মাটির দিকে দিয়ে বৃষ্টির মতো কাঁদছিলেন; ফাতিমা, আলী, হাসান ও হোসাইন এই অবস্থা দেখে ভীষণ দুঃখ অনুভব করলেন; তাদের সাথে আমিও ব্যথিত হয়েছিলাম এবং মহান রসূলের (সা.) প্রতি মহব্বতের কারণে সেই অবস্থার কারণ জিজ্ঞাসা করতে এবং রাস‚লের কান্না থেকে তাঁকে বিরত রাখতে আমরা সাহস পাচ্ছিলাম না। এই অবস্থা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হলে হযরত আলী ও হযরত ফাতিমা (সা.আ.) বললেন: হে আল্লাহর রাস‚ল! আল্লাহ যেন আপনার চোখকে অশ্রুসিক্ত না করেন, কি হয়েছে যে আপনাকে এতটা কাঁদিয়েছে আর আপনার এমন অবস্থা হয়েছে যে আমাদের হৃদয়কেও ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে?

রাস‚লুল্লাহ (সা.) বললেনঃ হে আমার ভাই (আমার বন্ধু)! তোমার কারণে আমি এতটাই খুশি ছিলাম যে কখনো এত খুশি হইনি, আমি তোমার দিকে তাকিয়ে তোমার জন্য আল্লাহ আমাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন তার প্রশংসা করছিলাম, এমন সময় হঠাৎ জিব্রাইল অবতরণ করলেন এবং বললেন: হে মুহাম্মদ! আল্লাহ, মহান ও মহিমান্বিত, তিনি আপনার মনে যা ঘটেছে সে সম্পর্কে অবগত আছেন এবং আপনার ভাই, কন্যা এবং দুই সন্তানের প্রতি আপনার আনন্দানুভূতির কথা জানেন। তাই তিনি আপনার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন এবং স্বীয় স্বচ্ছ অনুগ্রহ হতে আপনাকে অধিক পরিমাণ দান করেছেন ও আদেশ দিয়েছেন যে তারা, তাদের বংশধর, তাদের বন্ধু এবং শিয়ারা জান্নাতে যেন আপনার সাথে থাকে, আপনার এবং তাদের মধ্যে কোন দূরত্ব যেন না থাকে, তারা যেন আপনার মতোই আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয় এবং তারা এতটাই আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে যে আপনি খুশি হবেন এবং সীমাহীন আনন্দিত হবেন।

আল্লাহর এই অনুগ্রহ ও অনুকম্পা পৃথিবীতে এমন অনেক কষ্ট ও দূর্ভোগের বিনিময়ে প্রদান করা হবে, আর এ কষ্ট ও দূর্ভোগ তাদের হতে আসবে যারা নিজেদেরকে মুসলমান বলে মনে করে এবং মনে করে যে তারা আপনার উম্মতের লোক -যারা আল্লাহ এবং আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট- তারা তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করবে, অত্যন্ত ভয়ানকভাবে জবাই করবে, তাদের হত্যার স্থান একে অপর থেকে আলাদা ও ভিন্ন ভিন্ন হবে এবং তাদের কবরগুলি দ‚রবর্তী স্থানে অবস্থিত হবে। এটা তাদের ও আপনার জন্য আল্লাহর ইচ্ছা। তাই প্রিয় ও মহিমান্বিত আল্লাহর ইচ্ছার প্রশংসা করুন এবং তাঁর নির্ধারিত পরিণামে সন্তুষ্ট থাকুন।

অতঃপর আমি আল্লাহর প্রশংসা করলাম এবং তিনি তোমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকতাম।
অতঃপর জিব্রাইল আমাকে বললেনঃ হে মুহাম্মদ! আপনার ভাই -আলী (আ.)- আপনার পর আপনার উম্মতের হাতে আক্রমণের শিকার হবে; সে আপনার শত্রুদের দ্বারা কষ্ট পাবে; অতঃপর সৃষ্টির মধ্যে নিকৃষ্টতম এবং সবচেয়ে জঘন্য ব্যক্তি যে হযরত সালেহ’র (আ.) অনুসারীর অনুরূপ সে তাকে হত্যা করবে, যে শহরে সে হিজরত করবে -কুফায়- সেই শহরটি তার শিয়া এবং তার পুত্রের শিয়াদের জন্মস্থান। যা-ই হোক, এ শহরে তাদের সমস্যা ও কষ্ট অনেক হবে এবং তাদের দুর্ভোগও হবে অনেক; এবং আপনার এই নাতি -হোসাইনকে ইশারা করে- ও তার বংশধরদের একটি দল, আহলে বাইত এবং আপনার উম্মতের নেককার লোকদের একশ্রেণীকে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা নামক ভ‚মিতে হত্যা করা হবে, আর সেই কারণে, সেদিন দুঃখের কোন সীমা থাকবে না এবং যার দুঃখ ও অনুশোচনা কখনও শেষ হবে না, সে দিন আপনার শত্রু এবং আপনার পরিবারের শত্রæ অনেক বেড়ে যাবে। যে জমিতে তাদের হত্যা করা হবে ঐ জমিটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ এবং সবচেয়ে সম্মানিত যেখানে বেহেশতের ধূলির পরশ আছে।

যখন সেই দিন আসবে যেদিন আপনার দৌহিত্র ও তার পরিবারবর্গকে হত্যা করা হবে এবং কাফের ও অভিশপ্ত দলের লোকরা তাকে ঘিরে ফেলবে, সেদিন পৃথিবী কেঁপে উঠবে, পর্বতগুলো নড়বে, সাগর উত্তাল হয়ে উঠবে, আসমান তার সমস্ত কিছুকে ঝাঁকুনি দিবে। এই সবই ঘটবে ক্রোধ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে হিসেবে কারণ তারা আপনার এবং আপনার বংশধরদের উপর দুর্যোগ সৃষ্টি করেছে, এটি ঘটবে এ জন্য যে তারা আপনার মহানুভবতাকে অসম্মান করেছে এবং আপনার বংশধরদের হত্যাকারীদের শাস্তি দিয়েছে। আর মহান আল্লাহ ছাড়া এগুলোর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না যদি না আপনার পরিবারের -যারা নির্যাতিত ও নিপীড়িত, যারা আপনার পরে সৃষ্টির উপর আল্লাহর কর্তৃত্বশীল- সমর্থন ও সাহায্য করার অনুমতি চায় ও তা পায়।

অতএব, আল্লাহ আকাশ, পৃথিবী, পর্বত ও সমুদ্র এবং তাদের মধ্যে যারা আছে প্রত্যেকের প্রতি একটি প্রত্যাদেশ প্রেরণ করবেন: আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহ, যাঁর থেকে পলায়নকারীরা রেহাই পায় না; কোন অবাধ্য যাঁকে অসহায় ও অক্ষম করতে পারে না, আমি সাহায্য করতে ও প্রতিশোধ নিতে সক্ষম, আমি আমার সম্মান এবং গৌরবের শপথ করে বলছি, যে কেউ নবী পরিবারের রক্তপাত করেছে বা তাদেরকে অসম্মান করেছে, তাদেরকে হত্যা করেছে, তাদের সাথে কৃত চুক্তি ও ইচ্ছাকে উপেক্ষা করেছে এবং তার পরিবারের প্রতি অন্যায় করেছে আমি অবশ্যই তাদেরকে এমনভাবে শাস্তি দেব যা বিশ্বের একজনকেও আজ পর্যন্ত দেইনি। এই সময়ে আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই নারীদের মত চিৎকার করে যারা আপনার মর্যাদার প্রতি অবিচার করেছে এবং আপনার পবিত্রতাকে হালাল গণ্য করেছে, তাদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করবে।

অতএব, প্রিয় এবং মহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর নিজ হাতে তাঁদের আত্ম হনন করার দায়িত্ব নেবেন এবং সপ্তম আকাশ থেকে ফেরেশতারা রুবি (ইয়াকুত) ও পান্নার (জামারুদ) পাত্র নিয়ে আসবেন যা আবে হায়াত দ্বারা পরিপূর্ণ থাকবে এবং বেহেশতের সুগন্ধ ও মনোমুগ্ধকর সৌরভ নিয়ে পৃথিবীতে আসবেন; আর সেই আবে হায়াত দ্বারা তাদেরকে গোসল দিবেন; ঐ সুগন্ধিগুলো তাদের শরীরে লাগাবেন; ফেরেশতারা তাদের উপর সারিবদ্ধভাবে নামায আদায় করবেন।

অতঃপর আল্লাহ আপনার উম্মতের মধ্যে এমন একটি দলকে পাঠাবেন যারা কাফেরদের দলভুক্ত নয় আর তারা ভাষা, কর্ম বা নিয়ত দ্বারাও এই রক্তপাতে অংশগ্রহণ করেনি, তারা মৃতদেহগুলোকে দাফন করবে ও অন্যান্য আচারানুষ্ঠানাদি শেষ করে সেই মরুভ‚মিতে সাইয়্যেদুশ শোহাদা’র কবরের উপর একটি নিশান প্রতিস্থাপন করবে যা সত্যবাদীদের জন্য পরিণত হবে বিখ্যাত ও কেন্দ্রবিন্দুতে আর মুমিনদের জন্য বয়ে আনবে সাফল্য ও সৌভাগ্য এবং প্রতিটি আকাশ থেকে এক লাখ ফেরেশতা তার জন্য তোহফা ও উপহার নিয়ে আসবে আর প্রতি দিন ও রাতে, তার উপর দরূদ পাঠ ও তাকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করবে, তার কবরের কাছে আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করবে এবং তার তীর্থযাত্রী তথা যিয়ারতকারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে এবং যারা আপনার আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য তাকে দেখতে যাবেন তাদের নাম, পিতার নাম, বংশ ও শহরের নাম লিখতে থাকবে এবং একটি হাতিয়ারের মাধ্যমে তাদের চেহারায় আল্লাহর আরশের নূর দিয়ে সীলমোহর করে দিবে: কিয়ামতের দিন ঐ সীলমোহর ও চিহ্নের স্থান থেকে এমন আলো জ্বলবে যার দিকে তাকালে চোখ ঝলসে যাবে; এই নূর দ্বারাই চিনতে পারবে এবং এমন মনে হবে যেন আপনি হে মুহাম্মদ, আমার এবং মিকাইলের মাঝে অবস্থান করছেন আর আলী আমাদের সামনে এবং অগণিত ফেরেশতা আমাদের সাথে আছেন। আর যাদের চেহারাতে এই চিহ্ন আছে আমরা তাদেরকে বাছাই করে নিব আর সেদিনের ভয়াবহতা ও সহিংসতা থেকে রক্ষা করবো এবং এই ঐশ্বরিক আদেশ ও তাঁর অনুগ্রহ শুধুমাত্র তাদের জন্য যারা হে মুহাম্মদ, আপনার কবর অথবা আপনার ভাইয়ের কবর, অথবা আপনার দুই সন্তানের কবর যিয়ারত করবে আর এই যিয়ারতের মাধ্যমে তারা সর্বশক্তিমান আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া আর কিছুই চাইবে না।

শীঘ্রই, একটি দল যাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ ও গজব নিশ্চিত হয়েছে, তারা চেষ্টা করবে এই কবরের নাম ও চিহ্নকে ধ্বংস করতে এবং এর প্রভাব মুছে ফেলতে, কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে সফল হতে দিবে না। অতঃপর আল্লাহর রস‚ল (সা.) বললেন: এই বিষয়টি শুনেই আমি কাঁদতেছিলাম এবং দুঃখিত ছিলাম।

হযরত যয়নাব (সা.আ.) বলেন: যখন ইবনে মুলজিম যার উপর আল্লাহর অভিশাপ হোক, আমার পিতাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করেছিল আর যে কারণে তিনি মৃত্যুর সাথে লড়াই করছিলেন ও আমি তাঁর মধ্যে মৃত্যুর ছাপ দেখতে পাচ্ছিলাম, তখন আমি বললাম: হে আমার পিতা! উম্মে আয়মান আমাকে একটি বিষয় সম্পর্কে জানিয়েছে এবং আমি আপনার কাছ থেকেও ঐ বিষয়টি সম্পর্কে শুনতে চাই।

বাবা বলেছিলেন: হে আমার কন্যা! হাদীসটি উম্মে আয়মান যেমন বলেছে তেমনই।
মনে হচ্ছে যেন আমি দেখতে পাচ্ছি যে তুমি ও তোমার পরিবারের অন্যান্য মহিলারা এই শহরে -কুফা- শত্রæদের হাতে বন্দী এবং আটক রয়েছো এবং তুমি ভয় পাচ্ছো যে তোমার লোকজনকে তারা মেরে ফেলবে, তাই আমি বলবো ধৈর্য ধারন কর এবং আবারও বলবো ধৈর্যশীল হও, কারণ আমি তাঁর শপথ করে বলছি যিনি বীজকে অঙ্কুরিত করেন ও সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন, সে সময় তুমি ও তোমার বন্ধুরা ছাড়া আর কেউ থাকবে না এবং আল্লাহর রস‚ল যখন আমাদেরকে এ সংবাদ দিয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন: সেদিন ইবলিস মহা আনন্দের সাথে উড়ে বেড়াবে এবং সারা বিশ্বের সকল শয়তান ও তাদের দোসররা একত্রিত হবে ও সে বলবে: হে শয়তানের দল! আমরা নিজ ইচ্ছায় আদম বংশের উপর কর্তৃত্ব অর্জন করেছি এবং তাদেরকে চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছি ও তাদের জন্য জাহান্নামের ব্যবস্থা করতে পেরেছি কিন্তু যারা এই দলে (আহলে বাইতের) যোগদান করেছিল তাদের ব্যতীত। সুতরাং, এখন তোমরা মানুষের মধ্যে তাদের সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করে দাও এবং তাদের সাথে শত্রæতা করতে বাধ্য কর, তাদের ও তাদের অভিভাবকদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার জন্য সাহস জোগান দেওয়াকে তোমাদের প্রধান কাজ গণ্য কর যাতে মানুষের গোমরাহী ও বিভ্রান্তি এবং অবিশ্বাস শক্তিশালী হয় এবং কেউ যেন রক্ষা না পায় তাদের কাছ থেকে।

আর জানা গেছে যে, ইবলিস তাদের বিরুদ্ধে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে আর সে তো নিজেই একজন মিথ্যাবাদী। তবে এটা সত্য যে, যারা আপনার সাথে শত্রæতা করে তাদের কোনো কল্যাণকর কাজই কোনো উপকারে আসবে না এবং আপনার প্রতি ভালবাসা ও সৌহার্দ্য তাদের পাপ ব্যতীত কোনকিছুই বৃদ্ধি করবে না।

যায়েদা বলেন: তারপর হযরত আলী বিন হুসাইন (আ.) এই হাদিস সম্পর্কে সংবাদ দেওয়ার পর আমাদেরকে তিনি বলেন: “এটাকে গ্রহণ কর এবং ভালভাবে সংরক্ষণ করে রাখ, কারণ এটা এমন কিছু যা কোন অন্বেষণকারী যদি এটা অন্বেষণ করার জন্য এক বছরের অধিক সময় ধরে একটি উটের পিঠে চড়ে বেড়ায় তবুও তা তার জন্য সামান্য বলেই মনে হবে। (ইবনে কোলভিয়েহ, কামিলুয যিয়ারাত, পৃ. ২৬০-২৬৬)

তুমি দেখেছো যে হযরত যয়নাব (সা.আ.) নিজেই বলেছেন: যে সময় ইবনে মুলজিম আমার পিতার বরকতময় শরীরের উপর আঘাত করেছিল তখন আমি আমার পিতাকে সেই হাদিস ও সংবাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যেটি উম্মে আয়মান আমার কাছে বর্ণনা করেছিলেন।

এ বিষয়টি তারই ইঙ্গিত করে যে হযরত যয়নাব কুবরা (সা.আ.) জ্ঞান ও বিজ্ঞানের জন্য তৃষ্ণার্ত ছিলেন এবং এমনকি যখন তিনি উম্মে আয়মানের কাছ থেকে এটি শুনেছিলেন তখন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত যখন তার পিতা আলী (আ.) সুস্থ ছিলেন পিতাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেননি এবং এখন যখন তিনি দেখছেন তার পিতাকে হারাতে যাচ্ছেন কিন্তু সেই প্রশ্নটি রয়ে গেছে, তাই মনে করলেন যে বাবার নিকট প্রশ্নটি উত্থাপন করা দরকার যদিও বাবার অবস্থা আশংকাজনক ও মারা যাচ্ছে। যদি আমিরুল মুমিনীন আলী’র সাথে সম্পর্কহীন কোনো ব্যক্তি হত তাহলে হয়তো এটাকে এতটা গুরুত্বপ‚র্ণ মনে করতো না, কিন্তু হযরত যয়নাব (সা.আ.), যিনি তার সম্মানিত পিতার প্রতি আবেগ, ভালোবাসা ও স্নেহে পরিপ‚র্ণ এবং তার সান্ত¡না চান, তাই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ববহ। যাইহোক, ঐ অবস্থায় হযরত যয়নাবের (সা.আ.) প্রশ্ন করার বিষয়টি তার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও হাদিসের প্রতি অধিক আগ্রহের-ই ইঙ্গিত দেয়।

এটি উম্মে আয়মানের অসাধারণ গুরুত্বকে নির্দেশ করে এবং এটি একটি অত্যন্ত বিস্ময়কর ও ম‚ল্যবান হাদিস আর এতে নিষ্পাপ পরিবার (আ.) এবং শিয়া ও তাদের অনুসারীদের জন্য সকল প্রকার ফজিলত ও মর্যাদা রয়েছে এবং এটি ঐসব বর্ণনার অন্যতম যেসব বর্ণনায় গুপ্ত বিষয় রয়েছে যেমন:

  • ১. হযরত সাইয়্যেদুশ শোহাদা ও তাঁর বিশ্বস্ত সাথীদের শাহাদাতের সংবাদ।
  • ২. কারবালার শহীদদের লাশ দাফনের জন্য একদলের আগমনের খবর।
  • ৩. অবগত করা যে আবা আবদুল্লাহ ইমাম হোসাইনের (আ.) কবরের উপর আলাম বা নিশান ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে এবং একটি গম্বুজ, সমাধি তৈরি করা হবে যাতে সারা বিশ্ব থেকে লোকেরা তাঁকে দেখতে আসে।
  • ৪. কুফর, গোমরাহী ও ধর্মহীন নেতারা ইমাম হোসাইনের (আ.) মর্যাদাপূর্ণ কবরকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং তারা তাদের শয়তানী চক্রকে এই মহা অপরাধের জন্য ব্যবহার করবে যাতে এই আলো নিভানো যায়, সে সম্পর্কে অবহিত করা।
  • ৫. সেই সকল অপরাধী, যারা আল্লাহ থেকে গাফিল, তাদের মন্দ ও নারকীয় উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারবে না এবং সমস্ত প্রচেষ্টা ও কর্ম আল্লাহর কৃপায় নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং এই বিশ্বে ঐশ্বরিক আলো সর্বদা স্থিতিশীল থাকবে ও বিশ্ববাসীদের জন্য আলো ছড়াতে থাকবে, এ বিষয়ে আগাম তথ্য প্রদান।

এটা সত্য যে, হযরত যয়নাব (সা.আ.) যে প্রশ্নটি তাঁর উচ্চপদস্থ পিতাকে করেছিলেন, তিনি একদিকে শিয়া ও আহলে বাইতের অনুসারীদের প্রতি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়া ও অনুগ্রহ দান করেছেন, অন্যদিকে মহানবী (সা.)-এর বংশের গুণাবলী এবং মহান আল্লাহর কাছে তাদের মহানুভবতা ও মর্যাদার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। অপরদিকে, অদৃশ্য সংবাদ উল্লেখ করে যে সমস্ত ঘটনা তার স্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে তাদের ঈমান ও আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় করেছেন। যিনি এই মর্যাদাপূর্ণ ও ম‚ল্যবান হাদীসটির সন্ধান দিয়েছেন তিনি হলেন ইমাম আলী বিন হুসাইন (আ.) যিনি জায়েদাকে বলেছিলেন: যদি তুমি একটি উটে চড়ে এবং তাকে চাবুক দিয়ে প্রহার করে এটিকে দ্রুত চালনা কর এবং এক বছর সময় ধরে যাত্রা কর তারপরেও কম অর্থাৎ এই হাদীসটি এর চেয়ে বেশি ম‚ল্যবান এবং এটি অধ্যয়নের জন্য অবশ্যই অস্বাভাবিক কষ্ট সহ্য করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সত্য ও সঠিক বিষয়গুলো অনুধাবন করে সরল পথে পরিচালিত করুন। [তথ্যসূত্র: আকীলায়ে বানী হাশিম যয়নাব (সা.আ.) গ্রন্থ হতে]###

Share: