হযরত যয়নাব কুবরা’র (সা.আ.) বিবাহে অন্যতম শর্ত

  • Posted: 22/08/2022

ভাষান্তরঃ হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ আনিসুর রহমান

বিশ্বের প্রতিটি ধর্মেই নারী-পুরুষের দাম্পত্য জীবন শুরু করার ক্ষেত্রে কিছু রীতি-নীতি আছে তেমনি ইসলামী রীতি-নীতিতেও আছে যাকে বিবাহ বলা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের সম্মতিতে সংঘটিত হয় বিবাহ বন্ধন। তবে যদি ছেলে অথবা মেয়ে অথবা উভয়েই কোন শর্তারোপ করে সেই শর্তকেও মেনে চলতে হবে আর শর্ত মেনে চলা তখন হয়ে যায় আবশ্যক। অনুরূপভাবে হযরত যয়নাব কুবরা’র (সা.আ.) বিবাহেও তাঁর ও তাঁর পিতার পক্ষ থেকে শর্তারোপ করা হয়েছিল যা আমরা এই লিখনীতে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

হযরত আমিরুল মো’মিনীন আলী’র (আ.) বড় কন্যা হযরত যয়নাব (সা.আ.) শৈশবকাল অতিবাহিত করার পর এখন সময় এসেছে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার। হযরত যয়নাবের (সা.আ.) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য অনেকেই আগ্রহী, কারণ সমাজের কোন মেয়ে-ই তার বংশ ও মহত্বের দিক দিয়ে হযরত যয়নাবের (সা.আ.) স্তরে পৌঁছাতে পারেনি এবং এর চেয়ে বড় গৌরবের বিষয় আর কি হতে পারে যে, যিনি হযরত রাসূল (সা.), আমিরুল মো’মিনীন আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা জাহরা’র (সা.আ.) কোলে বেড়ে উঠেছেন, যিনি নিজেই একজন ফজিলত, গুণাবলী, মানবিকতা, উদারতা ও মহত্বের খনি।

কিছু কিছু বর্ণনা ও বাক্য থেকে বুঝা যায় যে, অনেকেই বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিন্তু এমন কে আছেন যিনি হযরত যয়নাবের (সা.আ.) উপযুক্ত হবেন এবং ঐ মহান ব্যক্তির সঙ্গিনী হওয়ার যোগ্যতার শর্তগুলো পূরণ করবেন?

এদিকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর যিনি ছিলেন পারিবারিকভাবে বিরাট সম্মানের এক অনন্য পুরুষ যাকে বনী হাশিমের অন্যতম সদস্য হিসেবে সবাই চিনতেন। তিনি ছিলেন ইমাম আমিরুল মো’মিনীন আলী’র (আ.) ভাই হযরত জাফরের সন্তান। হযরত জাফর, একদিকে আমিরুল মো’মিনীন হযরত আলী’র ভাই ছিলেন অপর দিকে তিনি একজন গর্বিত শহীদ ছিলেন, যিনি ইসলামের সকল সম্মানিত শহীদদের মধ্যে “তাইয়্যার তথা ডানাধারী” উপাধি অর্জন করেছেন এবং হাদিসের বর্ণনানুযায়ী জানা যায় যে, যেহেতু মুতা’র যুদ্ধে তাঁর দু’হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাই মহান আল্লাহ তাঁকে দু’টি ডানা দান করেন যা দিয়ে তিনি বেহেশতে উড়ে বেড়ান।

আব্দুল্লাহ’র সম্মানিত মা, আসমা বিনতে উমাইস যার ইসলামে উজ্জ্বল অবদানের কথা কারও অজানা নেই। তিনি তাদেরই একজন যারা দু’বার হিজরত করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন: একটি মক্কা থেকে জাফরের সাথে হাবাশা তথা আবিসিনিয়ায় এবং অপরটি মক্কা হতে পবিত্র মদীনায়। তিনি সর্বদা নবী পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, এমন কি হযরত ফাতিমা জাহরা’র (সা.আ.) শাহাদত ও দাফনেও -যে দাফনে হাতে গোনা মাত্র ক’জন উপস্থিত ছিলেন- অংশগ্রহণ করেছিলেন, এককথায় বলা যায় আব্দুল্লাহ’র পিতা-মাতা ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে।

আব্দুল্লাহ’র আরও অসংখ্য গৌরবোজ্জ্বল বিষয় আছে, কারণ তিনিই ইসলামের প্রথম জন্মগ্রহণকারী সন্তান যিনি তার পিতা-মাতার আবিসিনিয়ায় হিজরতকালীন সময়ে সেখানে জন্মলাভ করেন। এছাড়াও আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর, তিনি রাসূলের (সা.) একজন জলিলুল কদর সাহাবী ছিলেন ও রাসূলের (সা.) ইহকাল ত্যাগের সময় তার বয়স ছিল ১০ (দশ) বছর, তাই অব্যাহতভাবে তিনি রাসূলের (সা.) সাহচর্য লাভ করেন।

তিনি দয়ার্দ্র ও উদারতার প্রবাদতুল্য ছিলেন এবং তাঁর যুগে কেউ তাঁর বীরত্ব, সাহসীকতা ও দানশীলতার দিক দিয়ে সমকক্ষ ছিলেন না। তিনি প্রায় নব্বই বছর বেঁচে ছিলেন। তবুও তাঁর সম্মান, ভদ্রতা, মহানুভবতা ও মানবিকতার প্রভাবের কারণে তাঁর মৃত্যু ছিল এক হৃদয়স্পর্শী মৃত্যু এমন কি যারা নবী পরিবারকে পছন্দ করত না তারাও তাঁর মৃত্যুতে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে এবং দুঃখ প্রকাশ করেছে। বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি ৮০ (আশি) হিজরীতে মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন, আবান ইবনে উসমান যিনি আব্দুল মালেক মারওয়ানের নিযুক্ত মদীনার গর্ভণর ছিলেন- তিনি তাঁর গোসল ও কাফন পরানোর কাজে উপস্থিত হয়েছিলেন ও ততক্ষণ পর্যন্ত ছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁর জানাজা জান্নাতুল বাক্বীতে দাফন তথা কবরস্থ করা হয়, তার গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছিল ও বলছিল:

“আল্লাহর কসম! তুমি এমন কল্যাণকর ছিলে যে, কোনো অকল্যাণই তোমার মধ্যে মিশ্রিত ছিল না এবং আল্লাহর কসম! তুমি একজন সম্মানিত ও সৎকর্মশীল ব্যক্তি ছিলে।” (শারবাছী, আহমাদ, হাফিদাতুর রাসূলি নাফাহাত মিন সিরাতুস সাইয়্যেদাতু যাইনাব, পৃষ্ঠা ৩২)

অতএব, হযরত যয়নাব কুবরা’র (সা.আ.) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ছিলেন সবচেয়ে যোগ্য ও উত্তম ব্যক্তি যিনি প্রথমতঃ হযরত যয়নাবের (সা.আ.) নিজ বংশের ও নিজের চাচাতো ভাই। দ্বিতীয়তঃ তিনি সম্মান, মহানুভবতা, মানবিকতা ও মহত্তে¡র দিক দিয়ে ছিলেন অনন্য তাই এসব দিক বিবেচনা করে হযরত আমিরুল মো’মিনীন আলী (আ.) তাঁর প্রস্তাবকে স্বাগত জানান আর মহামহিম হযরত যয়নাব কুবরা’ও (সা.আ.) স্বানন্দে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন এবং এভাবেই এই সুন্দর ও পবিত্রতম বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল; যাদের বয়সের ব্যবধান ছিল ৫ (পাঁচ) বছর যদিও রাসূলের (সা.) ইন্তেকালের সময় হযরত যয়নাব কুবরা’র (সা.আ.) বয়স ছিল ৫ (পাঁচ) বছর ও হযরত আব্দুল্লাহ’র বয়স ছিল ১০ (দশ) বছর। দুর্ভাগ্যবশতঃ হযরত যয়নাব কুবরা’র (সা.আ.) বিবাহ সাল সম্পর্কে জানা যায় নি এবং এও জানা সম্ভব হয়নি যে, আব্দুল্লাহ’র সাথে বিবাহের সময় হযরত যয়নাব কুবরা’র (সা.আ.) বয়স কত ছিল।

এই সুখী ও সমৃদ্ধ দম্পতির বিবাহ সম্পর্কে আকর্ষণীয় যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে তা হচ্ছে, যখন হযরত আমিরুল মো’মিনীন আলী (আ.) এই বিবাহের ব্যবস্থা করবেন তার পূর্বে একটি শর্তারোপ করলেন: যখন হোসাইন (আ.) সফর করার ইচ্ছাপোষণ করবে ও যয়নাব যদি তার ভাইয়ের ঐ সফরে সফরসঙ্গী হতে চায় তাহলে আব্দুল্লাহ যেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে অর্থাৎ বাধা প্রদান না করে। এমন কি কিছু কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, এই শর্তটি বিবাহের সীগা তথা কলেমাতেও উল্লেখ করেছেন। (শেইখ ফারাজে আলে ইমরান কুতাইফী, ওফাতু যয়নাব আল-কুবরা, পৃষ্ঠা ৬০)

এই ঘটনাটি হযরত যয়নাব কুবরা’র (সা.আ.) কারবালা, কুফা ও শাম তথা সিরিয়া সফরের গুরুত্বারোপ করে ও এটি দ্বারা তিনি আমাদের বেশ ভালভাবে বুঝাতে চেয়েছেন যে, হযরত যয়নাব কুবরা’র (সা.আ.) সমর্থন ছাড়া ইমাম হোসাইনের (আ.) আন্দোলন অসফল ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হত, তাই এই মহান আন্দোলনের অগ্রগতি ও কার্যকারিতা হযরত যয়নাবের (সা.আ.) সফর ও সহযাত্রার সঙ্গে বিশেষ যোগসূত্র রয়েছে ও ইমাম আমিরুল মো’মিনীন হযরত আলী (আ.) যিনি আগামীর গোপন রহস্যের জ্ঞান রাখতেন এবং এই ভাই-বোনের সাহচর্যের বিস্ময়কর প্রভাব সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে জানতেন তাই তদানুযায়ী পটভূমিকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছিলেন যেন এই বিপ্লবের শুরুতে হযরত যয়নাব কুবরা’ (সা.আ.) কোনো বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন না হন ও তাকে যেন এই সফর থেকে কেউ বিরত না রাখে। এমন কি যদিও আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর হয়তো বাধা দিতে পারে -এ ধারণা অবশ্য অত্যন্ত ক্ষীণ ছিল কারণ, এ কাজ হযরত আব্দুল্লাহ’র শৌর্য-বীর্যের বরখেলাফ যে তিনি তার স্ত্রীকে তাঁর ভাই ইমাম হোসাইনের (আ.) সফরসঙ্গী হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন ও নিষেধ করবেন- এ সম্ভাবনাকেও নস্যাৎ করে দিয়েছেন; বিবাহের শর্তে হযরত যয়নাবের (সা.আ.) হস্ত মুক্ত রেখেছেন ও ইমাম হোসাইনের (আ.) সাথে যাওয়ার জন্য সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা পূর্ব থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছেন।

ইমাম হোসাইনের (আ.) সুখ-দুঃখের সাথী হযরত যয়নাব কুবরা’ (সা.আ.) তাঁর বিবাহে এই অন্যতম শর্তারোপ করে আমাদের এ শিক্ষা দিয়ে গেছেন যে, কোন বৃহত্তর বিষয় বাস্তবায়ন করতে গেলে বিপদ আসতেই পারে আর এই সমূহসম্ভাবনাকে স্বরণে রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে এবং কিভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় তার পূর্ব প্রস্তুতি থাকতে হবে ও সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। [সূত্র: আক্বীলায়ে বনী হাশিম হযরত যয়নাবে কুবরা’(সা.আ.)]###

Share: