বন্দী অবস্থায় ইমাম সাজ্জাদের (আ.) আন্দোলন

  • Posted: 24/09/2022

হুজ্জাতুল ইসলাম মো. আলী মোর্ত্তজা

আশুরার পর শিয়া এবং ইমামতে বিশ্বাসীদের জন্য একটি অতি ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। অত্যাচারী উমাইয়্যা শাসক কারবালা, কুফা এবং সিরিয়ায় মহানবীর আহলে বাইতের সাথে যে আচরণ করেছিল এবং হিংস্রতা দেখিয়েছিল তা সকল শিয়াকে আতঙ্কিত করেছিল। তবে আমরা জানি যে, ইমাম হুসাইনের সকল পারদর্শি সাহাবারা কারবালায় এবং তাওয়াবিনের আন্দোলনে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। সুতরাং যারা অবশিষ্ট ছিল তাদের পক্ষে ইয়াযিদ ও মারওয়ানের মত অত্যাচারী উমাইয়্যা শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি ও সাহস ছিল না। একদল মু’মিন যারা ছিল ছত্রভঙ্গ, ভীতসন্ত্রস্ত ও অসংগঠিত। প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল ইমাম থেকে বিচ্ছিন্ন। আর এটাই ছিল শিয়াদের মধ্যে ইমাম সাজ্জাদের অনুসারীদের অবস্থা। অতিরিক্ত নিপীড়ন সহ্য করে ও অতি দূর্বল সাহায্যকারী নিয়ে জালিমদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে এবং সঠিক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এরকম একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ৩৪ বছর সংগ্রাম করেছেন। আমি এখানে অতি সংক্ষেপে ইমাম সাজ্জাদের জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় উপস্থাপন করব।

ইমাম সাজ্জাদের (আ.) জীবনের প্রথম গৌরবোজ্জল অধ্যায়টি হচ্ছে তার বন্দিত্ব অবস্থা। ইমাম সাজ্জাদ দুইবার বন্দি হয়েছেন এবং দুইবার তাকে শিকলাবদ্ধ অবস্থায় সিরিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রথমবার ইয়াযিদের সময়ে কারবালা থেকে আর দ্বিতীয়বার মদিনা থেকে আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানের সময়ে। ইমাম সাজ্জাদকে প্রথমবার যখন কারবালা থেকে সিরিয়ায় বন্ধি করে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তিনি ছিলেন কোরআন ও ইসলামের প্রতিকৃতি। কারবালার শহীদদের শাহাদাতের পর থেকেই ইমাম যাইনুল আবেদীন সাজ্জাদের জীবনের ট্রাজেডি শুরু হয়। ছোট্ট মেয়েরা, ছোট ছোট শিশুরা এবং অসহায় নারীরা ইমামের চারপাশে অবস্থান করছিল এবং ইমাম একমাত্র পুরুষ হিসাবে তাদের সকলকে নেতৃত্ব দান করেন। ইমাম সাজ্জাদ সকলকে একত্রিত করলেন এবং সিরিয়া পর্যন্ত তাদেরকে সঠিকভাবে দেখাশুনা করলেন। আর তাদের ঈমানকে সামান্যতম দূর্বল হতে দেন নি। কুফায় প্রবেশ করলেন, উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ নবী পরিবারের সকল পুরুষদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল। ইমাম সাজ্জাদকে দেখে সে প্রশ্ন করল: তুমি কে? ইমাম বললেন: আমি আলী ইবনিল হুসাইন। তখন সে ইমাম সাজ্জাদকে হত্যা করার হুমকি দিল। তখন ইমাম তাঁর ইমামত, আধ্যাত্মিকতা এবং নেতৃত্বের একটি ঝলক দেখিয়ে বললেন: তুমি আমাকে হত্যা করার হুমকি দিচ্ছ? তুমি কি জাননা যে শাহাদাত আমাদের সম্মান, আল্লাহর রাস্তায় নিহত হওয়া আমাদের অহঙ্কার। আমরা মৃত্যুকে কখনোই ভয় পাই না। তখন উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ ইমামের সাহসিকতা ও দৃঢ়তার কাছে পরাজিত হল।

সিরিয়াতেও যখন ইমামকে দিনের পর দিন অত্যন্ত খারাপ পরিবেশে বন্দি অবস্থায় রাখার পর ইয়াযিদ মনে করল ইমামকে মসজিদে নিয়ে গিয়ে তাকে মানসিকভাবে আরও দূর্বল করতে হবে। আর এমন কাজ করতে হবে যাতে ইমামের সমর্থকরা এবং ইয়াযিদের বিরোধীরা তার হুকুমতের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নিতে পারে। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ওই বৈঠকে ইয়াযিদকে বললেন: অনুমতি দিলে আমিও ওই কাঠের মিম্বরে জনগণের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলতে চাই। ইয়াযিদ বুঝতে পারে নি যে, রাসূলের যুবক সন্তান ওই অসুস্থ অবস্থায় এবং বন্দি অবস্থায় তার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে তাই সে অনুমতি দিল। ইমাম সাজ্জাদ মিম্বারে উঠে ইমামতের দর্শন, শাহাদাতের ঘটনা এবং উমাইয়্যাদের অত্যাচারের বিষয়টি পরিস্কারভাবে তুলে ধরলেন। ইমাম এমন কাজ করলেন যে, সিরিয়ার জনগণ ইয়াযিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। অর্থাৎ ইমাম ইয়াযিদের দরবারে তাদের গণ্যমান্য লোকদের মাঝে সাহসিকতার সাথে সত্যকে তুলে ধরলেন এবং জনগণের বিবেককে জাগ্রত করলেন। কেননা ইমামের কাছে এই দুনিয়ার সামান্যতম কোন মূল্য নেই।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) অসুস্থ ও বন্দি অবস্থায় মহান বীরদের ন্যায় কথা ও আচরণের মাধ্যমে বিপ্লব সাধন করেছেন। ইমামের এই সময়ের জীবনের সাথে তার আসল তথা স্বাভাবিক জীবনের অনেক পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। জীবনের আসল সময়ে তিনি নরম পন্থায় ভিত্তিমূলক কাজ করেছেন। যেখানে এমনও হয়েছে যে, তিনি আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানের সাথে বৈঠক করেছেন এবং তার সাথে স্বাভাবিক ও নরম আচরণ করেছেন। কিন্তু এই বন্দিত্ব অবস্থার মধ্যে ইমাম বড় বিপ্লবীরূপে আবির্ভূত হয়েছেন এবং সামান্যতম কোন অন্যায় কথাকে বর্দাস্ত করেন নি। সবার সামনে ক্ষমতাসীন দুশমনের প্রতিটি কথার কড়া জবাব দিয়েছেন।

কুফায়ও হিংস্র, রক্তপিপাসু এবং সহিংস উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের বিরুদ্ধে এমনভাবে তিনি প্রতিবাদী হন যে সে ইমামকে হত্যা করতে প্রস্তুত হয়। তখন মহীয়সী বিবি যাইনাব বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এমনটি না হলে হয়তো ইবনে যিয়াদ ইমামকে সেখানে হত্যা করে বসত।

কুফার বাজারেও তিনি ফুফি যাইনাব এবং বোন সাকিনার সাথে একত্রিত হয়ে জনগণকে সোচ্চার করেন এবং সত্য ও হকিকতকে ফাঁস করে দেন। সিরিয়াতেও তিনি মসজিদে এবং ইয়াযিদের দরবারে বিশাল জনতার মাঝে সকল সত্যকে প্রকাশ করেন। ইমাম সাজ্জাদের এই সকল বক্তব্য এবং খোতবাসমূহে আহলে বাইতের সত্যতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। আর অত্যাচারী ইয়াযিদের সকল অত্যাচার ও অন্যায়কে তুলে ধরা হয়েছে। আর ওই জাহিল ও উদাসীন জনগণকেও এভাবে তিনি সতর্ক করে দেন।

এখানে আমি ওই খোতবার ব্যাখ্যা দিতে চাচ্ছি না। কেননা তার জন্য গভীরভাবে আলাদা কাজ করা দরকার। কাজেই যারা এই খোতবার তাফসীর করতে চায় তারা যেন প্রতিটি শব্দকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা দেয়। এটাই হচ্ছে বন্দি অবস্থায় ইমাম সাজ্জাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও আন্দোলন।

এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, কেন ইমাম সাজ্জাদ বন্দি অস্থায় অত্যন্ত কড়া জবাব দিয়েছিলেন এবং খুব বেশী প্রতবাদী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নরম হয়ে যান এবং তাকিয়াহ পদ্ধতি অনুসরণ করে দোয়ার মাধ্যমে মোলায়েম পদ্ধতি অবলম্বন করেন?

উত্তর হচ্ছে, এই অধ্যায়টি ছিল একটি ব্যতিক্রমধর্মী অধ্যায়। এখানে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ইমাম হওয়ার পাশাপাশি আগামীতে ঐশী ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পেক্ষাপটও তাকে তৈরি করতে হবে। তাই তিনি কারবালার শহীদদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় কথা বলেছেন। ইমাম সাজ্জাদ এখানে নিজের রূপে নন বরং তিনি ইমাম হুসাইনের রূপে কুফা এবং সিরিয়ায় আবির্ভূত হন। সেখানে যদি ইমাম সাজ্জাদ অগ্নিশিখা হয়ে গর্জে না ওঠেন এবং প্রতিবাদী কণ্ঠ হয়ে কথা না বলেন তাহলে পরবর্তীতে তিনি কোন কাজ করার সুযোগ পাবেন না। কেননা তাঁর কাজের প্রেক্ষাপটই ছিল ইমাম হুসাইনের পবিত্র রক্ত। যেভাবেই ইমাম হুসাইনের পবিত্র রক্ত পরবর্তী সকল বিপ্লবের জন্যও প্রেক্ষাপট হিসাবে কাজ করেছে। প্রথমে তিনি জনগণকে সতর্ক করলেন। আর পরবর্তীতে সেই সকতর্কতার আলোকে তাঁর পরবর্তী গভীর ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ শুরু করেছিলেন। আর এই সতর্কবার্তা পৌঁছানো এমন প্রতিবাদী কণ্ঠ ছাড়া সম্ভব নয়।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এই সফরে হযরত যাইনাব কোবরা’র ভূমিকাও পালন করেছেন। অর্থাৎ ইমাম হুসাইনের বিপ্লবের বার্তা তিনি সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। যদি মানুষ জানতে পারে ইমাম হুসাইন শহীদ হয়েছেন, কেন হয়েছেন এবং কিভাবে হয়েছেন তাহলে ইসলামের ভবিষ্যত এবং আহলে বাইতের দাওয়াতের ভবিষ্যত এক রকম হবে আর যদি না জানতে পারে তাহলে অন্য রকম হবে। সুতরাং সমাজের এই জ্ঞান ও পরিচিতি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সাধ্যমত সকল চেষ্টা ও প্রচেষ্টা চলানোর প্রয়োজন ছিল। সুতরাং ইমাম সাজ্জাদও ফাতিমা সোগরা, যাইনাবে কোবরা, উম্মে কুলসূমসহ কারবারার সকল বার্তাবাহকের মত একজন বড় বার্তাবাহক ছিলেন। এভাবে সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করার মাধ্যমে মজলুমভাবে শহীদ হওয়া হুসাইনি রক্তের বাণীকে বিশ্বের আনাচে কানাছে পৌঁছে দিতে হবে। অর্থাৎ কারবালা থেকে মদিনা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। ইমাম সাজ্জাদ যখন মদিনায় পৌঁছবেন তখন সবার সামনে তাকে সত্য ঘটনা তুলে ধরতে হবে এবং এটাই হচ্ছে প্রথম পদক্ষেপ। সুতরাং ইমাম সাজ্জাদের জীবনের এই ছোট অধ্যায়টি একটি ব্যতিক্রমধর্মী অধ্যায়। ইমাম সাজ্জাদের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় তখন শুরু হল যখন তিনি মদিনায় অবস্থান নিলেন এবং রাসূলের ঘর ও পবিত্র মাজার থেকে কাজ শুরু করলেন। ইমাম সাজ্জাদের কর্মসূচী স্পষ্ট করার জন্য আমাদেরকে তাঁর যুগের পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে পর্যালোচনা করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন।

(তথ্যসূত্র: পাসদারে ইসলাম, ৬; মহামান্য রাহবার হযরত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী’র দৃষ্টিতে হযরত যাইনাব কোবরা ও কারবালার বার্তাবাহকদের আন্দোলন) ###

 

 

Share: