জাফরি ফিকাহ’র আলোকে ফৌজদারি দণ্ডবিধির রায় প্রদান ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করার কারণসমূহ (৫ম পর্ব)

  • Posted: 11/10/2022

লেখকঃ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন ড. আব্দুল কাইউম

ইতিপূর্বের আলোচনার ধারাবাহিকতায় আমরা বলব যে, জেলখানায় কোনো অসুস্থ অপরাধী ব্যক্তিকে (যে ব্যক্তি অপরাধ করার পর অসুস্থ হয়ে পড়েছে) বন্দী রাখা না রাখার ব্যাপারটিও তিনভাগে বিভক্ত।যথা:

প্রথম দল: সেই সব অপরাধী ব্যক্তি যাদের অসুস্থতা ঔষধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। এ প্রকারের অপরাধী ব্যক্তিরা জেলখানার ক্লিনিক বা আরোগ্যকেন্দ্রে উপস্থিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে শাস্তি ভোগে সামর্থ্যবান হয়ে উঠবে।

দ্বিতীয় দল: সেই সব অপরাধী ব্যক্তি এ দলের অন্তর্ভুক্ত যারা ঔষধপত্রের শৃঙ্খলা বিধান করার জন্যে কিংবা কোনো অস্ত্রোপচারের জন্যে মেডিকেলে শয্যা গ্রহণ করতে বাধ্য; যেমন যক্ষ্মা রোগ। এ ধরনের অপরাধী ব্যক্তিরা কারাবন্দী হওয়ার মত শাস্তি ভোগ করতে সক্ষম এবং তারা বিশেষজ্ঞের মতামত অনুসারে মেডিকেলে উপস্থিত হওয়ার জন্যে ছুটি গ্রহণ করবে। আর চিকিৎসার সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়াসহ শারীরিক অবস্থা সুস্থ হলে কারাবন্দী হওয়ার মেয়াদ পূর্ণ করবে।

তৃতীয় দল: সেই সব অপরাধী ব্যক্তি এ দলের অন্তর্ভুক্ত যারা কঠিন ও দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত; যেমন- এইড্স, সিরোসিস, যকৃতের পুরাতন ব্যাধি প্রভৃতি। এই তৃতীয় শ্রেণীর অসুস্থ অপরাধী ব্যক্তিদেরকে যদি জেলখানায় বন্দী রাখা হয় তাহলে তাদের পেছনে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করার প্রয়োজন দেখা দিবে; তাদের প্রতি বিশেষ নজরদারির প্রয়োজন হবে; এ ধরনের রোগগুলো সংক্রামক হওয়ার ফলে জেলখানার অপর বন্দীদেরকেও সংক্রামিত করে তুলতে পারে; আর এ কারণেই তাদের ক্ষেত্রে এই আদেশ বা রায় ঘোষণা করা জরুরী হয়ে পড়বে যে, তারা শাস্তি ভোগের শারীরিক যোগ্যতা রাখে না। তবে বিষয়টি সহজেই নিরূপণযোগ্য নয়; বরং এ ক্ষেত্রে আইনসম্মত চিকিৎসক কিংবা চিকিৎসকের বোর্ড বিভিন্ন রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবলমাত্র এ বিষয়ক সার্টিফিকেট প্রদান করবেন এবং এরই আলোকে বিচার বিভাগ সিদ্ধান্ত নিবেন এবং তাদের শাস্তি মওকুফ করে দিবেন কিংবা শাস্তি কার্যকরের ব্যাপারে স্থগিতাদেশ দিবেন। কোনো উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যতীত, নিছক বাহ্যিক আলামত দেখেই শাস্তি মওকুফ কিংবা শাস্তি কার্যকরের স্থগিতাদেশ দেয়াটা সমীচীন হবে না।

আমরা এতক্ষণ যাবৎ সেসব অপরাধী ব্যক্তিকে নিয়ে কথা বলছিলাম যারা অপরাধ করার পর বিভিন্ন অসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে এবং এসব অসুখ তাদের শাস্তিদানের রায় প্রদান কিংবা শাস্তি কার্যকর করার আদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব করানোর যোগ্যতা রাখে কি না- তা নিয়ে। আমাদের এ বিষয়ক আলোচনার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এখন আমরা এ সম্পর্কিত নতুন এক বিষয় নিয়ে আলোচনায় আসছি এবং তা হচ্ছে গর্ভবতী অবস্থা, শিশু প্রসব ও দুগ্ধদানকাল। আমাদের আলোচ্য বিষয়বস্তুই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আমাদের আলোচনা এখন শুধুমাত্র নারী অপরাধীদেরকে কেন্দ্র করে।

জীবনযাপনের বিভিন্ন স্তরে নারীদের জৈবিক বৈশিষ্ট্যসমূহের প্রতি ইসলামি আইনবিদ ও আইন প্রণেতাগণ গভীর মনোযোগ দিয়েছেন। নারীর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে গর্ভাবস্থা, সন্তান প্রসব ও স্তন্যদানের সময় তার শাস্তি ভোগের সক্ষমতা হ্রাস পেয়ে যায় এবং বেত্রাঘাত কিংবা কারাদণ্ডের মত শাস্তি তার জন্যে এতটাই ক্ষতির কারণ হতে পারে যে, শাস্তি আরোপ করার মাধ্যমে, তার পূর্ব সুস্থাবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা সমস্যাগ্রস্থ হয়ে পড়ে কিংবা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সম্ভবতঃ এ কারণেই হযরত ইমাম আলি (আ.) গর্ভবতী নারী ও ছোট শিশুদের ব্যাপারে “হদ্দের” হুকুম কার্যকর করতে বিলম্ব করতেন। এমনকি ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার অপরাধে শাস্তি নির্ধারিত হওয়া এক নারী একদা সন্তানকে স্তন্যদানের কাল শেষ করে, নিজের উপর শাস্তি কার্যকর করার মানসিকতা নিয়ে ইমামের সমীপে আগমন করলে ইমাম (আ.) তাকে বলেন: “তুমি ফিরে গিয়ে এই শিশুটিকে লালন-পালন করে এতটাই বড় করে তুলবে যাতে সে নিজের প্রতিরক্ষা নিজেই করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে এবং তারপর তুমি রুজু বা প্রত্যাবর্তন করো!” যদিও হাদিসটির বাহ্যিক অর্থ এ কথার প্রমাণ দেয় যে, শিশু বা নবজাতকের লালন-পালনের কল্যাণের দিকটি “হদ্দ” দ্রুত কার্যকর করার কল্যাণের উপর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত হয়েছে, তথাপি এ বিষয়টিও খুব দূরবর্তী নয় যে, এ সময়ে শাস্তি ভোগ করার মত নারীর শারীরিক সক্ষমতা ছিল না।

অপর এক হাদিসে উল্লেখ হয়েছে, হযরত ইমাম আলি (আ.) বলেন: একদা আল্লাহর রসুলের (সা.) এক দাসী ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়লে তিনি আমাকে তার উপর “হদ্দ” কার্যকর করতে বলেন। কিন্তু আমি উপলব্ধি করতে পারলাম যে, সে নেফাসের (সন্তান জন্মের পর জরায়ু হতে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার) অবস্থায় রয়েছে। আর এ জন্যে আমি শঙ্কিত হয়ে উঠলাম যে, তার উপর “হদ্দ” কার্যকর করলে তা তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। কাজেই, আমি “হদ্দ” কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। অতঃপর এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারটি আল্লাহর রসুলকে (সা.) অবগত করলে তিনি আমার মূল সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করার পাশাপাশি বলেন, “সাবাস! বেশ ভাল কাজ করেছ।” আর এর ফলে, তার “হদ্দ” কার্যকর করতে বিলম্ব করা হয়। এ হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ দেয় যে, এই সময়ে নারীদের শাস্তি ভোগ করার মত শারীরিক সক্ষমতা থাকে না। (চলবে) ###

Share: