আয়াতুল্লাহ মারআশি নাজাফী’র জীবনালেখ্য

  • Posted: 23/07/2022

আয়াতুল্লাহ মারআশি “নাজাফে আশরাফে” জন্মলাভ করেন এবং সেখানেই তিনি শিক্ষার্জন করেন। নাজাফে আশরাফে অবস্থান করাকালীন তিনি অনুভব করেন যে, ইসলামি কিতাবসমূহের পাণ্ডুলিপিগুলো (কলমি অনুলিপি) আগ্রাসীদের এজেন্টরা স্বল্পমূল্যে ক্রয় করে নিয়ে চলে যাচ্ছে, এ কারণে তিনি নিজেই সেই পাণ্ডুলিপিগুলো ক্রয় করে নিজের কাছে সঞ্চয় করতে শুরু করেন। কিন্তু কিতাব ক্রয় করার মত টাকা-পয়সা তাঁর নিকট ছিল না। আর এ কারণে তিনি মানুষের নামায ও রোযার হাদিয়া নিয়ে যে অর্থ পেতেন তার দ্বারা ইসলামি বই-পুস্তকের অনুলিপির বিরল বইগুলো ক্রয় করতেন। আর তিনি ক্রয় করা এই অনুলিপিগুলোর প্রচ্ছদের উপর তা ক্রয় করার হৃদয়গ্রাহী ঘটনাও লিখে রাখতেন।

যেমন: এই কলমি অনুলিপিসমূহের একটির অনুলিপির প্রচ্ছদে এই নোট লিখা রয়েছে:
“এটি আল্লামা আব্দুর রহিম ইবনে আহমদ হিন্দি বিহারি হানাফি যিনি “সুর” নামে খ্যাত তাঁরই লিখিত। এটি তিনি ১১৬০ হিজরিতে, স্বীয় সন্তান শেখ শাহাবুদ্দিন বিহারির জন্যে লিখেন এবং এ লিখনি সম্পন্ন হওয়ার কয়েক দিন পরই তিনি এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। এই কিতাবখানাই আমি মরহুম মির্যা মোহাম্মদ বায্যায তেহরানির নায়েব হিসেবে দুই বছরের ছুটে যাওয়া নামায আদায় করে যে ২০টি রুপি পাই তা দিয়েই ক্রয় করি। মহান আল্লাহ পরিশেষে দ্বীনের কাজের ক্ষেত্রে তওফিক দান করেন। নামায শুরুর তারিখ হচ্ছে ২১শে যিলক্বদ, ১৩২২ হিজরি। আমার হৃদয় পর্যুদস্ত হয়ে গেছে। এত পরিমাণ অর্থ! আমি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত অবস্থায় রয়েছি এবং ২০ ঘণ্টা যাবৎ খাবারের জন্যে এমন কোনো কিছুর ব্যবস্থা করতে পারিনি যা দ্বারা আমার ক্ষুধা মিটাতে পারি! মহান আল্লাহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রেফতার ব্যক্তিদের গ্রেফতারি দূরীভূত করুন!”

শাহাবুদ্দিন হুসাইনি মারআশি নাজাফি ১৩৪২ হিজরিতে কেওয়াম মাদরাসা যেটি আমার জাদ্দে আমজাদ (সম্মানিত পিতৃপুরুষ) আমিরুল মোমেনিনের (তাঁর জন্যে আমার জীবন উৎসর্গ হোক!) মাশহাদের একটি মাদরাসা- তা প্রতিষ্ঠা করেন।

একইভাবে তিনি যামাখশারির তাফসিরের কলমি অনুলিপির উপরও এই নোট লিখেন:
“এই কলমি অনুলিপিটিও আমি কারও ছুটে যাওয়া রোজা কাযা করার মাধ্যমে যে পারিশ্রমিক পাই সে অর্থ দিয়েই ক্রয় করি।”
তিনি যখন নাজাফে আশরাফ থেকে ইরানে চলে আসেন তখন এই সংগৃহীত কিতাবগুলোও সঙ্গে করে ইরানে আনেন এবং তিনি নিজ গৃহেই এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ শুরু করেন। তিনি আরও একাধিক অনুলিপি সংগ্রহ করেন। তিনি ১৩৮৫ হিজরিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান “মাদরাসা মারআশি’র” ভিত্তি স্থাপন করার পর, সেই মাদরাসারই দুইটি কক্ষ নিয়ে একটি ছোট আকারের গ্রন্থাগার নির্মাণ করেন। ১৩৪৪ ফার্সি সৌর হিজরিতে উক্ত মাদরাসার তৃতীয় তলায় এক নতুন গ্রন্থাগার উদ্বোধন করা হয়। এই গ্রন্থাগারের বিস্তৃত স্তরে জনগণের পাঠের সুব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এর আয়তনটিও আগত পাঠকদের জন্যে সংকীর্ণ বলে অনুমিত হয়। ফলে এক হাজার স্কয়ার মিটার আয়তনের উপর একটি গ্রন্থাগার নির্মাণ করা হয়। ১৫ই শাবান, ১৩৯৪ হিজরি, মোতাবেক ১২ই শাহরিওয়ার, ১৩৫৩ ফার্সি সৌর হিজরি মোতাবেক ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে একটি সাধারণ গ্রন্থাগারের উদ্বোধন করা হয় যেখানে প্রাথমিকভাবে কলমি অনুলিপি ও ছাপানো কিতাব মিলে ১৬০০০ কিতাবের বন্দোবস্ত করা হয়। এই কেন্দ্রে ব্যাপক বিস্তৃত স্থানের পাশাপাশি পাঠকদের ব্যবহারের জন্যে আধুনিক সামগ্রীরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই গ্রন্থাগারে প্রাচীন কলমি অনুলিপির পরিমাণ ও ধরনের দিক থেকে এটি আজ ইরানের সবচেয়ে বড় ও সমৃদ্ধ এবং মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারে পরিণত হয়েছে। এখানে আশি (৮০০০০) হাজারেরও অধিক কলমি অনুলিপি এবং দশ লাখেরও (১০,০০০০০) অধিক ছাপানো বই-পুস্তক রয়েছে।

আয়াতুল্লাহ মারআশি নাজাফির উপর কখনই হজ্ব ফরজ হয়নি এবং তিনি কখনই হজ্বের ইস্তেতাআত (সক্ষমতা) লাভ করেননি। একদল ব্যবসায়ী তাঁর হজ্বের ব্যয়ভার বহন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে হজ্বে যাওয়ার আহ্বান জানালে তিনি তা অস্বীকার করেন। একদা এক লোক তাঁকে এ প্রশ্ন করেন, “আপনার নিকট শরঈ অর্থ বিদ্যমান রয়েছে এবং সেগুলো আপনি দীনি ছাত্র ও গরিবদের মাঝে বণ্টন করছেন, এরপরও কিভাবে সম্ভব যে, আপনি হজ্বের মুস্তাতি (আর্থিকভাবে সক্ষম) হননি?” তখন উত্তরে তিনি বলেন: “এই অর্থ তো আমার না, এগুলো হচ্ছে ইমামের (আ.) অংশ, সাদাতের অংশ এবং রোযা প্রভৃতির কাফ্ফারা এবং এগুলো তার নিজ নিজ স্থানেই ব্যয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমি নিছক তখনই হজ্ব পালন করতে যাব যখন আমার নিজ পরিশ্রমে অর্জিত অর্থ এত পরিমাণ হবে যা দ্বারা আমি হজ্বের ব্যয়ভার যোগাতে পারব!” অবশ্য, তাঁর ইন্তেকালের পর একশ জনেরও অধিক লোক তাঁর পক্ষ হতে প্রতিনিধিত্বমূলক হজ্ব পালন করেছেন।

আলহামদু লিল্লাহ, আহলে বাইত মতাদর্শের উঁচুস্তরের আলেমগণ ও সম্মানিত মারজাগণ একে অপরের চেয়ে উন্নততর। সত্যিই তিনি হযরত ইমাম হাসান আসকারির (আ.) হাদিস যে, “নিজেকে দমনকারী, দ্বীনের সংরক্ষক, প্রবৃত্তির বিরোধিতাকারী ও স্বীয় মাওলার আদেশের আনুগত্যকারী’র” দৃষ্টান্ত ছিলেন।

আল্লাহ তাঁর মর্যাদাকে আরও বৃদ্ধি করুন এবং আমাদেরকে আরও বেশি বেশি করে তাঁর সীরাতের উপর চলার তওফিক দান করুন! আমিন!####

Share: